বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির মূল ভিত্তি ধান। প্রতিদিনই বাজারে ধানের বাজার দর কিছু না কিছু ওঠানামা করে। কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা—সবার জন্যই ধানের বাজার দর জানা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের ধানের দাম কেমন, সরকারি বনাম বাজারমূল্যের ব্যবধান কত, এবং অঞ্চলভেদে দামের তারতম্য কত—এই আর্টিকেলে সেই সব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও বিভিন্ন পাইকারি বাজারের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ ধানের বাজার দর উপস্থাপন করছি।
আরও জেনে নিনঃ সয়াবিন তেলের বাজার দর
আজকের ধানের বাজার দর
বাংলাদেশে প্রধানত মোটা, চিকন ও আধা-চিকন—তিন ধরনের ধানের চাষ হয়। নিচের টেবিলে বিভিন্ন জাতের ধানের বাজার দর উল্লেখ করা হলো।
| ধানের জাত | প্রতি মণ দাম (টাকা) | প্রতি কেজি দাম (টাকা) | অঞ্চল |
|---|---|---|---|
| মোটা (বিআর-১১, বিআর-২৩) | ২০০০-২২৪০ | ৫০-৫৬ | ঢাকা, ময়মনসিংহ |
| বাঁশফুল | ৩০০০-৩৪০০ | ৭৫-৮৫ | রাজশাহী, খুলনা |
| চিকন (বিরোই, পাইজাম, বালাই) | ২৪০০-৩১২০ | ৬০-৭৮ | বরিশাল, কুমিল্লা |
| হিরা-২ | ১৯২০-২০০০ | ৪৮-৫০ | দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও |
| ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-২৯ | ২২০০-২৩২০ | ৫৫-৫৮ | সিলেট, চট্টগ্রাম |
| বাংলা জিরাশাইল | ২৬০০-৩০০০ | ৬৫-৭৫ | বগুড়া, রংপুর |
উপরের টেবিলটি বর্তমান ধানের বাজার দরের একটি স্থিরচিত্র। তবে দাম অঞ্চল, পরিবহন খরচ ও মৌসুমভেদে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। ধানের বাজার দর সবচেয়ে বেশি বাঁশফুল ও জিরাশাইল জাতের, আর তুলনামূলক কম মোটা জাতের ধানের।
সরকারি ধানের ক্রয়মূল্য বনাম বাজারদর
সরকার প্রতি বছর বোরো ও আমন মৌসুমে ধানের ক্রয়মূল্য ঘোষণা করে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য বোরো ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে প্রতি কেজি ৩২ টাকা। এই দর অনুযায়ী ১ মণ ধানের দাম হওয়া উচিত ১২৮০ টাকা। কিন্তু বাজারে ধানের বাজার দর সেই দরের远远নীচে নেমে গেছে।
বর্তমানে জেলার পাইকারি বাজারগুলোতে ১ মণ বোরো ধান ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অর্থাৎ সরকারি দরের চেয়ে ৩০-৪০% কম দাম পাচ্ছেন তাঁরা। এই মূল্যহ্রাস কৃষকদের উৎপাদন খরচের চেয়েও কম। মণপ্রতি ধান উৎপাদনে খরচ হয় গড়ে ১১০০-১২০০ টাকা। ফলে কৃষকরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। এ প্রসঙ্গে ধানের বাজার দর স্থিতিশীল করতে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অঞ্চলভেদে ধানের বাজার দরের তারতম্য
উৎপাদন এলাকা, চাহিদা ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে ধানের বাজার দর অঞ্চলভেদে কিছুটা আলাদা হয়। নিচে কয়েকটি বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ বাজারের তথ্য দেওয়া হলো।
- ঢাকা বিভাগ (কারওয়ান বাজার): মোটা ধান ২১০০-২২৫০ টাকা/মণ, চিকন ধান ২৭০০-৩০০০ টাকা/মণ
- রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ: বাঁশফুল ধান ৩১০০-৩৩০০ টাকা/মণ, জিরাশাইল ২৮০০-২৯০০ টাকা/মণ
- চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ: ব্রি-২৮, ব্রি-২৯ ধান ২৩০০-২৪০০ টাকা/মণ, বালাই ধান ২৬০০-২৮০০ টাকা/মণ
- রংপুর ও দিনাজপুর: হিরা-২ ধান ১৯৫০-২০০০ টাকা/মণ, মোটা ধান ২০০০-২১০০ টাকা/মণ
এশিয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারেও ধানের বাজার দরের প্রভাব পড়ে। ভারত থেকে চাল আমদানি ও রপ্তানি নীতি পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের ধানের বাজারেও প্রভাব পড়ে।
চালের বাজারদর
ধানের দাম বাড়লে চালের দামও বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে ধানের বাজার দর কম থাকলেও চালের দরে তেমন পতন দেখা যায়নি। নিচে বিভিন্ন জাতের চালের বাজারদর দেওয়া হলো।
| চালের ধরন | পাইকারি মূল্য (কেজি) | খুচরা মূল্য (কেজি) |
|---|---|---|
| সরু (নাজিরশাইল, মিনিকেট) | ৬০-৬৮ টাকা | ৬৮-৭৮ টাকা |
| মাঝারি (পাইজাম, লতা) | ৫২-৫৫ টাকা | ৫৬-৬০ টাকা |
| মোটা (স্বর্ণা, চায়না ইরি) | ৪৬-৫০ টাকা | ৫০-৫৪ টাকা |
উল্লেখ্য, প্রতি মণ (৪০ কেজি) মিনিকেট চালের দাম ২৪০০-৩১২০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু ধানের বাজার দর কমলেও মিলিং, পরিবহন ও ব্যবসায়ী মুনাফার কারণে চালের দাগ তেমন কমে না।
কেন ধানের বাজার দর ওঠানামা করে?
কৃষকের মাঠ থেকে পাইকারি বাজার এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার—প্রতিটি স্তরেই ধানের বাজার দর প্রভাবিত হয় নানা কারণে। প্রধান কারণগুলো হলো:
- মৌসুমি ফলন: বোরো মৌসুমে ধানের ঘাটতি থাকলে দাম বাড়ে, উৎপাদন বেশি হলে কমে।
- আমদানি ও রপ্তানি নীতি: ভারত থেকে আমদানি বেড়ে গেলে বাজারে চাপ পড়ে, ধানের বাজার দর কমে যায়।
- সংরক্ষণ ও মজুত: কোল্ড স্টোরেজে ধান রাখতে ব্যয় বেশি, যার প্রভাব দামে পড়ে।
- পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগী: ভ্যান, ট্রাক ও দালাল পর্যায়ে মূল্য বাড়ে।
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বন্যা বা খরা ধানের ফলন কমিয়ে দেয়, ফলে দাম চড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ধানের বাজার দর কৃষকের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। উৎপাদন ব্যয় ও সুদ বিবেচনা করলে তারা মণপ্রতি ১২০০ টাকার নিচে ধান বিক্রি করতে পারছেন না।
ভবিষ্যতে ধানের বাজার দরের সম্ভাবনা
আগামী কয়েক মাসের দিকে তাকালে বিশেষজ্ঞরা কিছু প্রবণতা দেখছেন। চলতি বোরো মৌসুমের ফলন ভালো হওয়ায় জুন-জুলাই পর্যন্ত ধানের বাজার দর সম্ভবত ২০৫০-২৩০০ টাকা/মণ এর মধ্যেই থাকবে। তবে বর্ষা মৌসুমে বন্যায় ফসল নষ্ট না হলে স্থিতিশীল থাকবে। সরকার যদি টিসিবি ও খাদ্য বন্দোবস্তের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ বাড়ায়, তাহলে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা গেলে পরবর্তী মৌসুমে চাষ কমে যেতে পারে, যা দাম আবার বাড়িয়ে দেবে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: আজকের ধানের বাজার দর কত?
উত্তর: বর্তমানে মোটা ধান ২০০০-২২৪০ টাকা/মণ, চিকন ধান ২৪০০-৩১২০ টাকা/মণ এবং বাঁশফুল ৩০০০-৩৪০০ টাকা/মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
প্রশ্ন ২: ১ মণ ধানের দাম কত টাকা?
উত্তর: জাতভেদে ১ মণ ধানের দাম ১২৮০ টাকা (সরকারি বোরো ধান) থেকে ৩৪০০ টাকা (বাঁশফুল) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
প্রশ্ন ৩: কোন জাতের ধানের দাম সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: বাঁশফুল ও বাংলা জিরাশাইল ধানের দাম বেশি। বর্তমানে এদের বাজারদর ৩০০০-৩৪০০ টাকা/মণ।
প্রশ্ন ৪: কৃষকরা প্রকৃতপক্ষে কত টাকায় ধান বিক্রি করছেন?
উত্তর: বাজারের তথ্য মতে, বোরো ধানে কৃষকরা ৮০০-৯০০ টাকা/মণ দাম পাচ্ছেন, যা সরকারি মূল্য ১২৮০ টাকা/মণের চেয়ে অনেক কম।
প্রশ্ন ৫: ঢাকায় ধানের বাজারদর কত?
উত্তর: ঢাকার কারওয়ান বাজারে মোটা ধান ২১০০-২২৫০ টাকা/মণ, চিকন ধান ২৭০০-৩০০০ টাকা/মণ।
প্রশ্ন ৬: কোথায় কম দামে ধান পাওয়া যায়?
উত্তর: উৎপাদন এলাকা রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনায় ধানের দাম তুলনামূলক কিছুটা কম।
প্রশ্ন ৭: ধানের দাম কমার কারণ কী?
উত্তর: অতিরিক্ত উৎপাদন, ভারতীয় চাল আমদানি, মজুত সক্ষমতার অভাব ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কম দামের কারণ।
শেষ কথা
কৃষি নির্ভর দেশে ধানের বাজার দর কেবল অর্থনীতির নয়, লক্ষ লক্ষ কৃষক পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। বর্তমানে পাইকারি বাজারধারা অনেক জায়গায় কৃষকের পক্ষে অনুকূল নয়। প্রয়োজন সরকারি ক্রয় কার্যকরী করা, কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি দেওয়া এবং চাল রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করা। যতদিন কৃষির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হবে, ততদিন ধানের বাজার দর অস্থির থাকবে। আশা করি বর্তমান তথ্য আপনাকে সঠিক ধান বাজার বুঝতে সহায়তা করবে। ন্যায্য মূল্যে ধান কেনা ও বিক্রি সর্বান্তকরণে উৎসাহিত করুন।